আন্তর্জাতিকজাতীয়

আল-জাজিরার প্রতিবেদন ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরায় প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন’ শিরোনামের তথ্যচিত্রকে ‘মিথ্যা ও কাল্পনিক’ বলে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সংস্থাটি বলছে, এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী সম্পর্কে ‘অসংখ্য ভুল তথ্য’ পরিবেশন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনটি ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ করেছে সেনাবাহিনী।

সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত মধ্যরাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে এই প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, আল জাজিরার ওই প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সেনাবাহিনী প্রধানকে বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্বের দরবারে বিতর্কিত, অগ্রহণযোগ্য ও হেয় প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসত্য, বানোয়াট, মনগড়া, অনুমাননির্ভর ও অসমর্থিত তথ্য সংযুক্ত করে এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

এর আগে, গত ১ ফেব্রুয়ারি আল-জাজিরায় ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন’ তথ্যচিত্রটি প্রচার হওয়ার পর ২ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী সদর দফতর থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে সোমবারের প্রতিবাদলিপিতে।

এতে বলা হয়েছে, “পরিবেশিত তথ্যচিত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইসরাইল থেকে স্পাইওয়্যার কেনা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনী প্রধানের ভাইকে জড়িত করে কিছু মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।”

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী পাঠানো দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, “২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউএনডিপিও (UNDPO) জানতে চায়, প্রথমবারের মতো ‘সিগন্যাল ইউনিটের পরিবর্তে একটি সিগন্যাল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট’ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে মোতায়েন করতে বাংলাদেশ সক্ষম কি না। ওই ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের তালিকাও (Statement of Unit Requirement) পাঠায় জাতিসংঘ। ওই তালিকা অনুযায়ী ওই সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জন্য সে সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কিছু সরঞ্জাম মজুত না থাকায় এবং সেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করার প্রয়োজন হয়। এসময় বাংলাদেশ থেকে সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটটি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের পরে পাঠানো সম্ভব বলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি জাতিসংঘকে অবহিত করে।”

আইএসপিআর থেকে পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, “এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ যথাযথ সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হাঙ্গেরি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে একটি প্যাসিভ সিগন্যাল ইন্টারসেপ্টের কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা ২০১৮ সালের জুনে শেষ হয়। এই সরঞ্জামটি জাতিসংঘের চাহিদা অনুযায়ী কেনা হলেও পরে জাতিসংঘ তানজানিয়ার একটি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে মোতায়েন করায় ওই সরঞ্জাম আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছেই অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে জাতিসংঘের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ‘আল জাজিরা কর্তৃক উক্ত সিগন্যাল সরঞ্জামটি ইসরাইল এর তৈরি বলে যে তথ্য প্রচার করা হয় তা আদৌ সত্য নয় এবং সরঞ্জামটির কোথাও ইসরাইল-এর নাম লিখা নাই’— উল্লেখ করে প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনীতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এবং অনেকগুলো পর্যায় অনুসরণ করে সরঞ্জাম কেনা হয়। এখানে দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ নেই।”

আইএসপিআর বলছে, “এই সিগন্যাল সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগেই শুরু হয়। ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে এর আগের সেনাবাহিনী প্রধানের সময়কালে সেনাসদরের ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সরকার থেকে অনুমোদন গ্রহণ করে প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদফতর (ডিজিডিপি) সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০১৮ সালের ২৬ জুন চুক্তি করে। ফলে ওই সিগন্যাল সরঞ্জাম কেনা নিয়ে বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান বা হাঙ্গেরিতে বসবাসকারী তার ভাইয়ের কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যে সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, কেবল সেনাবাহিনী প্রধানের ভাইয়ের দীর্ঘ সময় ধরে হাঙ্গেরিতে বসবাসের বিষয়টিকে পুঁজি করে এই তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এখানে বলা আবশ্যক যে সেনাবাহিনী প্রধানের কোনো ভাই বা আত্মীয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোনো ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম সরবরাহ অথবা ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না। এটি সহজেই অনুমেয় যে এই তথ্যচিত্রটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি স্বনামধন্য এবং সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং তার পরিবারের ওপর কালিমা লেপনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য তৈরির অপচেষ্টা করার অপপ্রয়াস মাত্র।”

আইএসপিআরের প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ সেনাবাহিনী প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়, “যেখানে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অথচ তার আগেই সেনাবাহিনী প্রধানের ভাইয়েরা (আনিস ও হাসান) তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক, পরিকল্পিতভাবে দায়েরকৃত সাজানো ও বানোয়াট মামলা থেকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অব্যাহতি পান। ফলে ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ সেনাবাহিনী প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে তার কোনো ভাই কোন দণ্ডপ্রাপ্ত বা পলাতক আসামি অবস্থায় ছিলেন না। বরং সম্পূর্ণ অব্যাহতিপ্রাপ্ত হিসেবেই তারা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন এবং ওই সময় তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় বা চলমানও ছিল না। এরপর সেনাবাহিনী প্রধান ২০১৯ সালের এপ্রিলে সরকারি সফরে সিঙ্গাপুর ভ্রমণ শেষে ব্যক্তিগত সফরে মালয়েশিয়া যান এবং বড় ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করেন। অতএব বিষয়টি স্পষ্ট যে প্রতিবেদনে দেখানো সেনাবাহিনী প্রধানের তার প্রবাসী ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানে এবং মালয়েশিয়াতে সাক্ষাতের ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পলাতক আসামির সঙ্গে সাক্ষাৎ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি নির্লজ্জ অপপ্রচার মাত্র।”

আল-জাজিরার প্রতিবেদনের ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ সামি’র বিস্তারিত পরিচয় তুলে ধরে আইএসপিআর বলছে, “আল-জাজিরার প্রতিবেদনটিতে সামি নামের যে ব্যক্তির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, তার প্রকৃত নাম সামিউল আহমেদ খান। তার বাবা লে. কর্নেল মরহুম আব্দুল বাসিত খান (অব.)। ওই সামিকে এর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মিলিটারি পুলিশ চুরি, সেনা কর্মকর্তার পোশাক ও ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রতারণার অপরাধে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার করেছে। এসব অপরাধের দায়ে ২০০৬ সালে তাকে বাংলাদেশের সব সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। সামিউল আহমেদ খান বর্তমানে জুলকারনাইন সায়ের খান (বর্তমান পাসপোর্ট নম্বর ইজি০০৯২৯০২, আগের পাসপোর্ট নম্বর বিজে০৫২০২৬০, এসি৫০৭৫৬৪৭, ও বি১৭৬৫৬৪৯) নাম ধারণ করে এবং তার বাবার নাম কর্নেল ওয়াসিত খান ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে পলাতক অবস্থায় হাঙ্গেরিতে বসবাস করছে। এই প্রতারক অর্থলোভী ও জালিয়াত সামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে রমনা মডেল থানায় ২০২০ সালের ৫ মে একটি মামলা (নম্বর ২/৫/২০২০) দায়ের করা হয়, যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।”

আল-জাজিরার প্রতিবেদনটি ‘অসমর্থিত শোনা কথানির্ভর’ উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, “বিভিন্ন সময়ের কিছু খণ্ড খণ্ড ছবি বা দৃশ্য সংযোজন করে একটি অনুমাননির্ভর, অগ্রহণযোগ্য ও প্রমাণবিহীন তথ্য দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই তথ্যচিত্র সম্পাদনার কাজ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের প্রায় সম্পূর্ণ বিষয় অসমর্থিত শোনা কথা (হিয়ার সে)-নির্ভর এবং তথ্য প্রদানকারীকে আরেক পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্ন বা জেরার মুখোমুখিও করা হয়নি। এছাড়া সামির মতো একজন প্রতারক ও পলাতক ব্যক্তির কাছ হতে একতরফাভাবে প্রাপ্ত ও সাক্ষ্য হিসেবে অনির্ভরযোগ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ভিত্তিহীন তথ্যচিত্র তৈরি করার কারণে এই প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্যতা, প্রাসঙ্গিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে আরো উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান ও তার পরিবারকে সরাসরি মাফিয়া পরিবার হিসেবে উল্লেখ ও উপস্থাপনের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের সরকার কর্তৃক আইন অনুযায়ী নিযুক্ত সেনাবাহিনী প্রধান সম্পর্কে সাংবাদিকতার রীতি ও নীতি গর্হিতভাবে এরকম অপবাদ ও মিথ্যাচার চূড়ান্তভাবে অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত।”

আল-জাজিরার মতো একটি সংবাদ মাধ্যমের কাছ থেকে এ ধরনের প্রতিবেদন কাম্য নয় উল্লেখ করে প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, “পেশাগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ, সবার কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য সেনাবাহিনী প্রধানকে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া আল-জাজিরা কর্তৃক অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও কাল্পনিকভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত করার অপপ্রয়াস, যা সেনাবাহিনী ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।”#

পার্সটুডে