অন্যান্য সংবাদ

এখনই না থামালে বড় বিপর্যয়-এলিনা খান

নারী নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের এখনই না থামালে সামনে বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। ধর্ষণ ইস্যুতে পূর্বের এবং বিদেশিদের উদাহরণ টেনে সরকার তার দায় এড়াতে পারে না। যুব সমাজের এই ধস এখনই থামাতে না পারলে অচিরেই বড় একটি ধাক্কা আসবে। এমনটিই মনে করছেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলছে। এর কারণ, প্রতিকারের বিষয়ে মানবজমিনের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন এই মানবাধিকার নেত্রী। এলিনা খান বলেন, সিলেটের এমসি কলেজে ধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বেগমগঞ্জের ঘটনাসহ প্রত্যেক দিনই কম বেশি এমন ঘটনা ঘটছে। আগে একটি বিষয় মনে হতো যে, হাতে স্মার্টফোন থাকলে খারাপ বিষয় দেখে।কিন্তু না! আজকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আছে বলে আমরা অনেক গোপন খবর যেগুলো হয়তো জানতাম না সেগুলো এখন বেরিয়ে আসছে।
এবং সেটা জানতে পেরে আমরা প্রতিরোধ করারও চিন্তা ও চেষ্টা করছি। অর্থাৎ মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। সচেতন মানুষ হলে তো হবে না। পাশাপাশি যারা এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা নিজেরাও দেশের আইনকানুন সম্পর্কে জানলে সেটাকে তোয়াক্কা করছে না। কখনো রাজনৈতিক, কখনো ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এবং নিজেদের পেশিশক্তির ভয়ভীতি দেখায়। বাংলাদেশের যে অবস্থান বা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রথমত, আমাদের দেশে সমাজের অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এবং মূল্যবোধ ও নৈতিকতা যখন থাকে না তখন সমাজের অবক্ষয় দেখা দেয়। সেই পর্যায়ে এখন আমরা অবস্থান করছি। অথচ পরিবার, স্কুল-কলেজ যেখানে এই মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া হয়। জাপানে শিশুদের দশ বছর বয়স পর্যন্ত কেবল নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়। আর আমাদের দেশে শুধু কাঁধে বই আর প্রথম, দ্বিতীয় হওয়ার ধারণাই শিখানো হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকারের মানুষ তৈরি কাকে বলে? সেই রেসপেক্ট (সম্মান) মা, বোন, সমাজের অন্যান্য নারীকে সম্মান দেয়ার বিষয়টি তৈরি হয়নি। এমনকি বড়দেরকে সম্মান দেয়া সেটা ছেলে কিংবা মেয়ে যেই হোক সেই জায়গাটি কিন্তু আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি এখনো।
তিনি বলেন, আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এটার জন্য পরিবার যেমন মারাত্মকভাবে দায়ী তেমনি স্কুল-কলেজও দায়ী। যার কারণে প্রতিদিন নারীদের প্রতি যে অসম্মান-অবমাননা এটারই একটি অংশ। আরেকটি অংশ হচ্ছে কিছুদিন আগে একটি সংবাদ মাধ্যমে (পত্রিকা) দেখেছি যেখানে জোকসের মধ্যে বাবাকে মেয়ে জানতে চেয়েছে ‘সকালে মোরগ ডাকে কেন? উত্তরে বাবা বলেন, মোরগ ডেকে বলে মেয়েরা কি মিথ্যাবাদী।’ এটা কোনো জোকস হলো না। এর ফলে শিশুটি কিন্তু তার মা এবং বোনকে একইভাবে কল্পনা করছে। ফলে শিশুর ভেতরে তো সেই শ্রদ্ধাবোধটি থাকলো না। মজা করতে গিয়ে শিশুটিকে কি শিখালাম আমরা। না মূল্যবোধ, না মানবিকতা, না নারীর প্রতি, বোনের প্রতি, না পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতি বা বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান। এই লেখালেখির জায়গাটিতে আমাদের এখন চিন্তা-ভাবনা করা খুবই জরুরি। এই ধরনের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সরকারের প্রেস কাউন্সিলের শক্তিশালী একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এর মাধ্যমে বাচ্চারা পত্র-পত্রিকার বিষয়গুলো বিশ্বাস করে। আমাদেরকে সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মোটা দাগে বলতে গেলে, সমাজের মারাত্মক অবক্ষয়, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
তিনি বলেন, আমরা দেখি পুলিশ প্রশাসন, রাজনৈতিক অনেক নেতারা হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তখন সাধারণ মানুষ ভাবে তারাই যখন অপরাধ করছে আমরা করলে সমস্যা কোথায়? তুলনা করার যে প্রবণতার মধ্য দিয়ে একটি মারাত্মক ধস নেমেছে সে জায়গাগুলো নিয়ে সময় এসেছে রাজনীতিবিদদেরকে এখনই ভাবার। সরকার যদি নিজ দলের মধ্যে মনিটরিং সিস্টেম না করেন তাহলে কিন্তু এই ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে। এবং আমি মনে করি রাজনীতির ভেতরে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। শুধুমাত্র আমি সরকার দলের, না! মনে রাখতে হবে আমি জনগণের কাছে জবাবদিহি করবো। পূর্বে খারাপ ছিল বলেই তো মানুষ নতুনকে ক্ষমতায় এনেছে। সবসময় পূর্বের উদাহরণ যদি আমরা টানতে থাকি তাহলে তো সমাধান হবে না। মনে রাখতে হবে এখন সমাজের মূল্যবোধ ও নৈতিকতা যেমন পরিবারে নেই একইভাবে স্কুল-কলেজেও নেই। নারীকে সম্মান জানিয়ে কোনো কিছু লেখা সেটা আমরা দেখছি না। নারীকে বিদ্রূপ করে অনেক কথা লেখা হয় যেটা একজন নারী বা পুরুষ সকলের মনে একটি বিরূপ ধারণার জন্ম নেয়।  
সেখান থেকে এই ধরনের ঘটনা তৈরি হয়। আমরা এমন কোনো দোষ করবো না যে দোষ নারীকে অবমাননা করে। পত্র-পত্রিকায় সে জায়গা থেকে লেখালেখির বিষয়ে সবাইকে চিন্তা করতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্রকে এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিতে হবে। সরকার কঠোর হস্তে যদি তার সংগঠনকে মনিটরিং করতে না পারে সেক্ষেত্রে পূর্বে কি ঘটেছে বা বিদেশের উদাহরণ আমার প্রয়োজন নেই। আমি একটি বেস্ট (সুন্দর) জীবন পাবো বলেই তাদেরকে নির্বাচিত করেছি। উদাহরণ দিয়ে যদি বলা হয় তাহলে তো পূর্বে যারা ছিলেন তারাই ভালো। পূর্বে খারাপ ছিল বলেই আপনাকে এনেছে। বিদেশের একটি প্রদেশে যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আমাদের দেশে প্রতিদিন সেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সময় এসেছে আমাদেরকে, সরকারকে, রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। এবং তারা মনে করবে যে অবশ্যই আমাদেরকে এখান (ধর্ষণ) থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে একদিন যুব সমাজের যে ধস নেমেছে সেটা না থামাতে পারলে আমরা বড় একটি ধাক্কা খাবো। এবং আমাদের দেশ কোথায় যাবে জানি না।