দেশজুড়েপটিয়ার খবরপ্রিয় চট্রগ্রাম

শত শত টিউবওয়েল অকেজো;পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় খাওয়ার পানির তীব্র সংকট পটিয়ায়

পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ও হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের অনেক নলকূপ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে এসব গ্রামে খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, দুই ইউনিয়নের কিছু কারখানায় অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপ বসানোয় বাসিন্দাদের এই দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
ওয়াসার আওতাধীন এলাকা ছাড়া যেকোনো স্থানে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন করতে হলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সরকারি নলকূপ ছাড়া পটিয়ায় গভীর কিংবা অগভীর নলকূপ স্থাপন করতে কেউ তাদের কাছ থেকে অনুমোদন নেয়নি।
হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের হুলাইন গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ হাছান বলেন, ‘দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। প্রতি ফোঁটা পানি মেপে মেপে খেতে হয়।’
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মিলিটারি সেতু থেকে হাবিলাসদ্বীপ ও কোলাগাঁও এলাকার বেশির ভাগ কলকারখানায় অতিরিক্ত পরিমাণে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এর মধ্যে পানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এর ফলে কোলাগাঁও ইউনিয়নের কোলাগাঁও, লাখেরা, চাপড়া, চাপড়ি, সাঁততাতিয়া, বাণীগ্রাম ও নালান্ধ এবং হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের পাঁচুরিয়া, চরকানাই, হাবিলাসদ্বীপ, হুলাইনসহ ১২টি গ্রামে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
সূত্র জানায়, পটিয়ার বিভিন্ন কলকারখানায় দৈনিক কত লিটার পানি উত্তোলন করা হয় এবং নলকূপের গভীরতা কতটুকু, তা জানতে চেয়ে গত এপ্রিল মাসে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর চিঠি দিয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো জবাব মেলেনি। এদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) পানি-সংকটের বিষয়ে একটি জরিপ চালিয়েছে।
বেলার চট্টগ্রামের সমন্বয়কারী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘তিন মাস আগে দেখেছি, হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের তিন শতাধিক নলকূপের মধ্যে ১৮৫টি বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে।’ তিনি আরও বলেন, অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র গভীর নলকূপ বসানোর কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের পাঁচুরিয়া গ্রামের দুটি পাড়ায় গিয়ে জানা যায়, সেখানকার ৩৯টি নলকূপের মধ্যে ১৯টি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে। নলকূপের হাতল চেপে পানি তুলতে সমস্যা হওয়ায় ১৩টি নলকূপ থেকে যান্ত্রিকভাবে পানি তোলা হচ্ছে। আর সচল সাতটি নলকূপের মধ্যে কয়েকটি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ওঠে না।
স্থানীয় লোকজন জানান, একসময় ৫০০-৮০০ ফুট নিচ থেকে পানি উঠলেও দুই বছর ধরে ১২০০ ফুট গভীর থেকেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে হুলাইন, চরকানাই, পাঁচুরিয়া ও হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের মানুষ গত এপ্রিলে পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বরাবর লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, এ চার গ্রামের সাড়ে তিন শতাধিক নলকূপের মধ্যে বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে গেছে।
হুলাইন গ্রামের হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, তাঁদের বাড়ির সামনে সরকারিভাবে বসানো দুটি নলকূপ এক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।
পাঁচুরিয়া গ্রামের নিউটন বড়ুয়া জানান, তাঁদের এলাকার ২৫টি নলকূপের মধ্যে ২২টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ঋত্বিক চৌধুরী বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের মধ্যে পটিয়া উপজেলায় খাওয়ার পানির সংকট বেশি। তিনি বলেন, এসব এলাকার বিভিন্ন কলকারখানায় বেশি ব্যাসের গভীর নলকূপ স্থাপনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান বলেন, ‘কলকারখানায় গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি তোলার কারণে গত দুই বছরে আমার ইউনিয়নের ৯৯ শতাংশ নলকূপ বন্ধ হয়ে গেছে।’
হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের পাঁচুরিয়া এলাকায় বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির কারখানার ব্যবস্থাপক শাহ মোস্তফা কামাল বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানের গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।’
চরকানাই এলাকার আম্বিয়া ডাইং অ্যান্ড নিটিংয়ের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘তাঁদের প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত গভীর নলকূপ অনেক দিন আগের। তাই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনুমোদন নেওয়া আছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।’