অন্যান্য সংবাদআন্তর্জাতিককুমিল্লার খবরজাতীয়দেশজুড়েপ্রিয় চট্রগ্রামরাজনীতি

সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে অন্য এক সম্রাট


বাংলাদেশি ক্যাসিনো সম্রাটদের দেখা পাচ্ছেন না সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডস বা এমবিএস-এ নিয়মিত যাতায়াতকারী জুয়াড়িরা। গল্প-আড্ডায় তাদের স্মৃতি আওড়াচ্ছেন তারা। কত কথা, কত কাহিনীর জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশি গেমলাররা। ঢাকার সম্রাট সিঙ্গাপুরেও ছিলেন নাম্বার ওয়ান। যে ক’জন জুয়াড়ি জিতে কিংবা হেরে পাইজা চেয়ারম্যান কার্ড অর্জন করেছেন সম্রাট তার অন্যতম। তার সর্বশেষ খেলা ছিল এমবিএস-এর পাইজা রুমে। যার অবস্থান ক্যাসিনোর তৃতীয় তলার এক্সক্লুসিভ জোনে। ওই এলাকায় সাধারণ জুয়াড়িদের পা ফেলা বারণ।

তবে একজন পাইজা মেম্বার নারী বা পুরুষ দু’জন সহযোগীকে স্পন্সর করতে পারেন।

ওই অঙ্গনে চীনা বংশোদ্ভূত এক পাইজা প্লাটিনাম মেম্বারের সহযোগী হিসেবে যাতায়াতকারী সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশের যশোর অঞ্চলের এক বাসিন্দা মানবজমিনকে বলেন, যেকোনো ক্যাসিনোর জন্য পাইজা মেম্বার হীরার টুকরার মতো, মূল্যবান। মিলিয়ন ডলার খেলে ধাপে ধাপে এটি অর্জন করতে হয়। পাইজা মেম্বারদের আবার অনেকগুলো স্তর আছে। পয়েন্ট রেট সুযোগ-সুবিধায় ফারাক অনেক। এটি অর্জনে একেক দেশে একেক নিয়ম। দুনিয়াসেরা লাসভেগাস বা মিশিগানের এমজিএম ক্যাসিনো কিংবা চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল মেকাও সর্বত্রই সমাদৃত পাইজা মেম্বাররা। তবে তাদের সুবিধাদি ভিন্ন। দেশভেদে তারতম্য হয়।

ক্যাসিনো-জুয়াড়ি ইসমাঈল হোসেন সম্রাট সত্যিই এক বিস্ময়। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যিনি পাইজা প্রিমিয়াম, পাইজা প্লাটিনাম এই দুই ধাপ উতরিয়েছেন। এরপর অর্জন করেছেন পাইজা চেয়ারম্যানের খেতাব। সিঙ্গাপুরে পৌঁছেই টের পাই, সম্রাটকে চেনেন না এমন প্রবাসী বাংলাদেশি কম। জুয়া যেহেতু বৈধ, তাই এ নিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে বেগ পেতে হলো না। সম্রাটের নাইট লাইফের নানান চাঞ্চল্যকর কাহিনী সিঙ্গাপুরের বসবাসরত বাংলাদেশি জুয়াড়িদের মুখে মুখে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক মুকুটহীন সম্রাট। পাইজা চেয়ারম্যান হিসেবে তার আগমন হতো বাদশাহী স্টাইলে। আগেই চুঙ্গি এয়ারপোর্টে অপেক্ষমাণ থাকতো মেরিনা বে সুপরিচিত ব্ল্যাক লিমুজিন হাই সুপার কার। সম্রাট নামতেন সম্রাটের মতোই। ইমিগ্রেশনের বাইরে থাকতো প্রটোকল। ক্যাসিনো কাম লাক্সারি হোটেল মেরিনা বে সেন্ডস-এর একজন ম্যানেজার ফুলেল শুভেচ্ছায় তাকে বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতেন এবং এস্কট করে নিয়ে যেতেন। সম্রাটের ঘনিষ্ঠরাও ওই এস্কট বা প্রটোকলের বেষ্টনীতে ঢুকতে পারতেন না। সিঙ্গাপুরের আইনে বরাবরই বড় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার অপশন এবং প্রমোশন রয়েছে।

কত ডলার নিয়ে ঢুকছেন? এমন প্রশ্নে ইমিগ্রেশনে জেরবার হন অনেকে। বিশেষ করে বাঙালিরা। কিন্তু ‘সম্রাট বাঙালি’ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, অন্য রকম উচ্চতায়। বলাবলি আছে জুয়াড়ি হিসেবে সম্রাটের ট্র্যাক রেকর্ডে ক্রম উন্নতির দ্বিতীয় ধাপেই ঢাকায় সরজমিন লোক পাঠিয়ে আমেরিকান কোম্পানি মেরিন বে সেন্ডস ক্যাসিনো তার অর্থকড়ি এবং পারিবারিক বন্ধনের তথ্য নিয়েছে। ইতিবাচক রিপোর্টই এসেছিল। ক্যাসিনো গেমলারদের ‘গোম্বল রেসপনসিবিলিটি’র অংশ হিসেবে প্রত্যেক বড় জুয়াড়ির পারিবারিক বন্ধনের তথ্য সংগ্রহে সিঙ্গাপুরের আইনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্থানীয় পুলিশ এবং ক্যাসিনো প্রশাসনের লোকজনের ব্রিফ তাই বলছে। ক্যাসিনোর কঠোর নীতি-বিধান মানলে সম্রাটের সংসারে এমন হাল হতো না- ছবি দেখে এমনটাই বললেন চীনা বংশোদ্ভূত এক জুয়াড়ি। তার মতে, সম্রাটের বিপদ কাটেনি। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর স্টেটম্যান্ট আমলে নিলে অন্তত এক বছরের জন্য সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে নিষিদ্ধ হবেন তিনি। শুধু তাই নয়, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল কাউন্সিল অব প্রবলেম গাম্বলিং (এনসিপিজি)-এর কাউন্সেলিংয়ের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। এমনটাই বলছেন ক্যাসিনো আইন বিশারদরা।
বিমানবন্দরে সম্রাট যে প্রটোকল পেতেন এটা পাইজা প্লাটিনাম থেকে শুরু করে ডায়মন্ড এবং সর্বোচ্চ চেয়ারম্যান পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল জুয়াড়িরা পেয়ে থাকেন। তাদের ৩টি বিশেষ প্রাপ্যতার প্রধান প্রাপ্য এটি। সম্রাট তা পেতেন। এটা বড় কিছু নয়। একজন পাইজা চেয়ারম্যানের জন্য এটা ডাল-ভাতই বলা যায়। তবে বাড়তি বিষয় ছিল তার জন্য আগে থেকেই মেরিনা বে সেন্ডস-এর লাক্সারি স্যুট বুকিং। মেম্বার বা চেয়ারম্যানশিপ কার্ডের সঙ্গে হোটেল স্যুটের বিলের সম্পৃক্ততা রয়েছে কয়েক হাজার ডলার। খেলায় জয়ী হলে পয়েন্ট দিয়ে বিল পরিশোধের সুযোগ থাকে। অন্যথায় ক্রেডিট কার্ড বা নগদে পরিশোধ করতে হয়। স্যুট বরাবরই এনজয় করতেন সম্রাট। তিনি বাইরে থেকেছেন এমন আলামত পাওয়া যায়নি। ওই স্যুটে সম্রাটের মতো বড় জুয়াড়িদের সুযোগ-সুবিধা অনেক। হোটেল কর্তৃপক্ষের ঘোষণা মতে, এটাই ভিআইপি গেস্টরা বেশি এনজয় করেন। স্যুটে থাকা গেস্টদের বড় সুবিধা হচ্ছে আরলি চেক ইন অ্যান্ড লেট চেক আউট। সম্রাটের খেলার এক চাইনিজ পার্টনার বলছিলেন- সম্রাট আসতেন দেরিতে। ওই রুমে এসে নাস্তা করতেন। পাইজা রুমের সান্ধ্যকালীন স্পেশাল এক্সক্লুসিভ অফার স্পাগু ডিশ তার পছন্দের ছিল।

‘ক্যাসিনো সম্রাট’ ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নেশা ও ‘পেশা’ ছিল জুয়া খেলা। তিনি একজন পেশাদার জুয়াড়ি। আলোচিত এই সম্রাট টাকার বস্তা নিয়ে জুয়া খেলতে সিঙ্গাপুরে যেতেন- ঢাকায় এমনটা বলাবলি আছে তার আত্মগোপন এবং আটকের পর থেকেই। মাসে অন্তত ১০ দিন তিনি সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলেন- এমন কথাও চালু আছে ঢাকায়। কিন্তু না, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকার-প্রফেশনাল থেকে শুরু করে সাধারণ বাংলাদেশি ওয়ার্কার, যারা দিন দুনিয়ার খবর রাখেন তারা এ বক্তব্যের সঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। তাদের মতে, সম্রাট তো নয়ই, খুচরা জুয়াড়িদেরও ঢাকা থেকে টাকা বা ডলার এনে সিঙ্গাপুরে খেলতে হয় না। এখানে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার নিয়ে বসে আছেন দেশি-বিদেশি হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। তারা শুধু আশীর্বাদ আর নিরাপদ লেনদেনের নিশ্চয়তার কাঙ্গাল। অন্য কিছু নয়।

উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে সেন্ডস ক্যাসিনোতে পূর্ব-পশ্চিম, কাছের-দূরের বিভিন্ন দেশ থেকে জুয়াড়িরা আসেন। তাদের কাণ্ডকারখানা সরজমিন দেখেছেন এই প্রতিবেদক। তাদের সঙ্গে তার কেটেছে দুটি নির্ঘুম রাত। বাংলাদেশি জোয়ান-বুড়ো নানা বয়সী অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। পেশাগত প্রয়োজনে ওই ক্যাসিনোর প্রাথমিক (প্রিমিয়াম) সদস্যপদ পূরণ করা এবং তার সুবাদে সহযোগী হিসেবে এক গোল্ডকার্ডধারীর সঙ্গে দ্বিতীয়তলার এক্সক্লুসিভ রুমে খেলা দেখা, কমপ্লিমেন্টারি খাওয়া, আড্ডায় পরিচিত অনেকের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জুয়াড়ি কেবল সম্রাট বা তার নিয়মিত সঙ্গী যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমানুল হক আরমান, মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার, বাবুল আর নাম জানা এই ক’জন নয়। সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে পা পড়েছে এমন হাই ক্লাস বাংলাদেশির সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তালিকা অনেক দীর্ঘ। শখের বশে হলেও অনেকে এখানে খেলেছেন, খেলছেন। জুনিয়র সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের নিয়মিত দেখা মিলে সেখানে। নারী জুয়াড়ি এবং মিডিয়া মুঘলরাও যান, তবে অনিয়মিত। (সূত্র: মানবজমি)