আন্তর্জাতিকজাতীয়দেশজুড়েরাজনীতি

৩০ বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করেও আসামে ‘বিদেশী’ সানাউল্লাহ, আটক

মোহাম্মদ সানাউল্লাহ (৫২)। ভারতে সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন ৩০ বছর। বর্তমানে তিনি আসাম পুলিশের সীমান্ত বিষয়ক উইংয়ের ডেপুটি ইন্সপেক্টর। কিন্তু তাকে বিদেশী ঘোষণা করেছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। ফলে আসাম পুলিশ তাকে আটক করেছে বুধবার। পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সীমান্তবর্তী শহর গোয়ালপাড়ার বন্দিশিবিরে। এতে প্রচ-রকমভাবে ভেঙে পড়েছেন সানাউল্লাহ। প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে কথিত যেসব অভিবাসীর বিরুদ্ধে সরকার দমনপীড়ন শুরু করেছে অত্যধিক বিতর্কিত সেই উদ্যোগের একটি ঘটনা এটি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর দিয়েছে অনলাইন ম্যানোরমা। রয়টার্স সানাউল্লাহকে কারগিল যুদ্ধের বর্ষীয়ান যোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

তাকে আটক করে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বন্দিশিবিরে। এ সময় তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। ৩০ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করার পর এটাই হলো আমার জন্য উপহার। তিনি বলেন, আমি একজন ভারতীয়। ‘ভেরি মাছ অ্যান ইন্ডিয়ান’। চিরদিন একজন ভারতীয়ই থাকবো। 

আসামে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষকে এনআরসির আওতায় নিজেদেরকে ভারতীয় প্রমাণ দিতে হয়েছে। এর আওতায় যারা পড়েন নি তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, বাংলাভাষী মুসলিমদেরকে লক্ষ্য করে। ভারত দাবি করছে, এসব মানুষ বাংলাদেশী। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে যারা ভারতে গিয়েছিলেন শুধু তাদেরকেই নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। 

ওদিকে সানাউল্লাহকে আটক করার বিষয়ে আসাম পুলিশের সিনিয়র এক কর্মকর্তা মৌসুমি কলিতা সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি ৩০ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। তাকে বিদেশী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, তাকে আটক করে বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়েছে। আমরা এক্ষেত্রে শুধু ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুসরণ করেছি। তাকে কেন বিদেশী ঘোষণা করা হলো, কিসের প্রেক্ষিতে সে বিষয়ে আমরা অবহিত নই। 

সানাউল্লাহর আইনজীবী দাবি করেছেন, তার মক্কেলকে সনাক্ত করতে ভুল করা হয়েছে। কারণ, আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে আমার মক্কেল একজন দিনমজুর বা শ্রমিক। তিনি বৈধ ডকুমেন্ট ছাড়াই ১৯৭১ সালের পরে ভারতে প্রবেশ করেছেন। তবে সানাউল্লাহর পরিবার বলছে, ১৯৩৫ সাল থেকে আসামে তাদের জমিজমা আছে। এ বিষয়ে রেকর্ডও আছে তাদের কাছে। আইনজীবী আমান ওয়াদুদ অবৈধ অভিবাসী বিষয়ক আরো বেশ কয়েক ডজন মামলা হাতে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সানাউল্লাহর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে বৃহস্পতিবার তিনি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করবেন। 

ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মধ্যে ৪০০০ কিলোমিটার সীমান্তের বেশির ভাগই স্পর্শকাতর। এতে আরো বলা হয়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সমর্থন দেয় নয়া দিল্লি। ওই সময় বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভারতে চলে যান। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর যারা প্রবেশ করেছেন তাদেরকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করছে ভারত। এ উদ্যোগটি শুরু হয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে। এবার তারা ভূমিধস বিজয় পেয়েছে লোকসভা নির্বাচনে। তারা সারাদেশে অবৈধ অভিবাসীকে সনাক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে সেখানে আশ্রয় নেয়া সব অমুসলিমকে নাগরিকত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাকিদের অর্থাৎ মুসলিমদের বের করে দেয়ার কথা বলেছে। তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি আসামে এবং পশ্চিমবঙ্গে খুব ভাল ফল করেছে। আর এটা হয়েছে মূলত অভিবাসী বিরোধী জিকির তুলে। অভিযোগ করা হয়েছে, এসব অভিবাসী কর্মসংস্থান ও সম্পদ ভোগ করছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় একটি সামান্য ভুলের জন্য নাগরিকত্ব পরীক্ষায় একটি পরিবার একেবারে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।